আদালত স্পষ্ট করে বলেছে, যখন এমন নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাতে থাকে, তখন তা আইনের প্রচলিত অনুমানের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে। সুতরাং, যে শিশু প্রমাণিতভাবে অন্য কারও সন্তান, তার রক্ষণাবেক্ষণের দায় অভিযুক্তের ওপর চাপানো যায় না।
বিবাহিত সম্পর্কের মধ্যে শিশু জন্ম নিলেও, যদি ডিএনএ (DNA) টেস্টে প্রমাণিত হয় যে সংশ্লিষ্ট পুরুষটি ওই শিশুর ‘বায়োলজিকাল’ বাবা নন, তবে তাঁকে শিশুর রক্ষণাবেক্ষণের (maintenance) জন্য খরচ দিতে বাধ্য করা যাবে না (Supreme Court DNA test maintenance ruling)।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় কারোল এবং বিচারপতি এন কে সিং-এর বেঞ্চ এই রায় দিয়েছে। দিল্লি হাইকোর্টের আগের একটি রায়কে বহাল রেখে এক মহিলার করা আপিল খারিজ করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত (Supreme Court verdict child maintenance)।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলার বয়ান অনুযায়ী, অভিযোগকারিণী অভিযুক্তের বাড়িতে তিন বছর ধরে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। মহিলার অভিযোগ, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অভিযুক্ত তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে তাঁদের বিয়ে হয় এবং পরের মাসেই (এপ্রিল, ২০১৬) শিশুটির জন্ম হয়। দাম্পত্য সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হওয়ায় ওই বছরের জুলাই মাসে মহিলা আদালতে নিজের ও মেয়ের জন্য মাসে ২৫ হাজার টাকা অন্তর্বর্তীকালীন রক্ষণাবেক্ষণ এবং সুরক্ষা আদেশের আবেদন জানান।
আইনি লড়াই ও ডিএনএ রিপোর্ট (DNA report vs statutory presumption)
মামলা চলাকালীন বিচার বিভাগীয় আদালত অভিযুক্তের ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন মঞ্জুর করে। রিপোর্ট অনুযায়ী, অভিযুক্ত পুরুষটি শিশুটির জৈবিক পিতা নন। এই তথ্যের ভিত্তিতে এবং মহিলা তাঁর আয় গোপন করেছেন, এই পর্যবেক্ষণ করে আদালত রক্ষণাবেক্ষণের আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর প্রথম আপিল আদালতও ওই একই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ
দিল্লি হাইকোর্ট ভারতীয় সাক্ষ্য আইনের ১৮৭২ সালের ১১২ ধারা নিয়ে পর্যালোচনা করে। এই ধারায় বৈধ বিবাহের সময় জন্ম নেওয়া শিশুকে আইনত বৈধ বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু আদালত জানায়, যেহেতু মহিলার সম্মতিতেই ডিএনএ পরীক্ষা হয়েছে এবং এর ফলাফল নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই, তাই এই বিশেষ ক্ষেত্রে আইনের সেই প্রচলিত অনুমান (statutory presumption) কার্যকর হবে না।
সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায়কে সমর্থন করে জানায়, সাধারণ ক্ষেত্রে পিতৃত্ব বিবাদে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে আদালত সতর্ক থাকলেও, এই মামলাটি আলাদা। এখানে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং তা উভয় পক্ষের কাছে চূড়ান্ত বলে স্বীকৃত।
আদালত স্পষ্ট করে বলেছে, যখন এমন নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাতে থাকে, তখন তা আইনের প্রচলিত অনুমানের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে। সুতরাং, যে শিশু প্রমাণিতভাবে অন্য কারও সন্তান, তার রক্ষণাবেক্ষণের দায় অভিযুক্তের ওপর চাপানো যায় না। এই কারণে আদালত মহিলার আপিলকে “গুণমানহীন” (bereft of merit) বলে খারিজ করে দিয়েছে।
শিশুর কল্যাণে আদালতের নির্দেশ
রায়ের আইনি দিকটি স্পষ্ট হলেও, শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আইনি স্বচ্ছতা যেন শিশুর বাস্তব সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে আদালত দিল্লি সরকারের নারী ও শিশু উন্নয়ন দফতরের সচিবকে নির্দেশ দিয়েছে। শিশুটির জীবনযাত্রা, শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলো খতিয়ে দেখা এবং যেখানে ঘাটতি থাকবে, সেখানে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে বলে আদালত জানিয়েছে।
Partha Goswami
23/04/2026







