ভোটের আগে ৩ দিন বাইক চলাচল বন্ধ কেন? নির্বাচন কমিশনকে নজিরবিহীন ভর্ৎসনা কলকাতা হাইকোর্টের। নাগরিক অধিকার খর্বের অভিযোগে শুক্রবারের মধ্যে হলফনামা তলব বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের।
নির্বাচনের (West Bengal Election 2026) নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই প্রশাসনিক রাশ চলে যায় নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) হাতে। কিন্তু সেই ‘অবাধ’ ক্ষমতা প্রয়োগ করে কি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করা যায়? বৃহস্পতিবার এই মৌলিক প্রশ্নটিই তুলে দিল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta Highcourt)।
ভোটের ৭২ ঘণ্টা আগে থেকে রাজ্যে মোটরবাইক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনকে নজিরবিহীন ভর্ৎসনায় বিদ্ধ করল আদালত। বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের সাফ কথা, “আইনি এক্তিয়ার বা ক্ষমতা থাকলেই নাগরিক স্বাধীনতায় যা খুশি তাই করা যায় না।”
জরুরি অবস্থা ঘোষণা!
এদিন মামলার শুনানিতে আদালতের মেজাজ ছিল অত্যন্ত চড়া। কমিশনের আইনজীবীর উদ্দেশে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও মন্তব্য করেন, “আপনাদের কর্তৃপক্ষ কেন সরাসরি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছেন না? দু’দিন আগে থেকে ইমার্জেন্সি ঘোষণা করেই ভোট করানো হোক। তাহলে অন্তত এটা মেনে নেওয়া যাবে যে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।”
আদালতের মতে, বাইক চলাচলের ওপর এমন দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা আসলে প্রশাসনিক দুর্বলতা লুকোনোর একটি প্রচেষ্টা মাত্র। বিচারপতি আরও যোগ করেন, “আপনারা কি নিজেদের কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে পারছেন না? এইভাবে সাধারণ নাগরিকদের চলাফেরার অধিকার হরণ করা অন্যায়।”
যুক্তি ও তথ্যের অভাব
হাইকোর্ট জানতে চেয়েছে, ঠিক কিসের ভিত্তিতে বা কোন তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? বিচারপতির প্রশ্ন, গত পাঁচ বছরে মোটরবাইক ব্যবহার করে কতগুলি অপরাধমূলক ঘটনা বা অশান্তি পাকানোর নজির রয়েছে? গত পাঁচ বছরে বাইক বাহিনীর বিরুদ্ধে ক’টি এফআইআর (FIR) দায়ের হয়েছে, সেই পরিসংখ্যানও আদালতের সামনে পেশ করতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি বিচারপতির শ্লেষাত্মক মন্তব্য, “বাইক নিয়ে যদি এতই ভয় থাকে, তবে গাড়ি চলাচলও বন্ধ করে দিন। গাড়ি ব্যবহার করেও তো লোকে অস্ত্রশস্ত্র বা বোমা নিয়ে গোলমাল পাকাতে পারে।”
অন্য রাজ্যের নজির ও নাগরিক হেনস্থা
সাধারণত ভোটের ২৪ ঘণ্টা আগে কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ আইনত স্বীকৃত হলেও, তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টা আগে থেকে সবকিছু স্তব্ধ করে দেওয়ার বিষয়টিকে ‘অযৌক্তিক’ এবং ‘নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেছে আদালত। বিচারপতি জানতে চান, ভারতবর্ষের অন্য কোনো রাজ্যে এমন বিজ্ঞপ্তির নজির আছে কি না।
সিসিটিভি ক্যামেরা এবং বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও কেন সাধারণ মানুষকে এভাবে হেনস্থা করার পথ বেছে নেওয়া হলো, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে আদালত। কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ হিসেবেই দেখছেন বিচারপতি কৃষ্য়া রাও।
হলফনামা তলব ও পরবর্তী শুনানি
আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, নিছক অনুমানের ভিত্তিতে নাগরিকদের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। এই প্রেক্ষিতে শুক্রবারের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে একটি বিস্তারিত হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। ওই হলফনামায় কমিশনকে ব্যাখ্যা দিতে হবে— কেন ৩ দিন আগে থেকে বাইক নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন মনে করল তারা? অতীতে বাইক নিয়ে ঠিক কী কী অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে তার রেফারেন্সও দিতে হবে।
ভোটের উত্তাপের মধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের এই কঠোর অবস্থান প্রশাসনিক মহলে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। শুক্রবার কমিশনের দেওয়া হলফনামার ওপর ভিত্তি করেই স্থির হবে যে, বাংলার রাস্তায় বাইক চলাচলের ওপর জারি করা এই ‘বেড়ি’ শেষ পর্যন্ত বহাল থাকবে, নাকি আদালত তা খারিজ করে দেবে।
নিরাপত্তার অজুহাতে ব্যক্তি স্বাধীনতার সীমা লঙ্ঘন করা যায় কি না, এই মামলার রায় তা নির্ধারণে এক বড় মাইলফলক হতে চলেছে।
Partha Goswami
23/04/2026







