রয়টার্স জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই টেলিকম দফতর (DoT) স্মার্টফোন নির্মাতাদের নির্দেশ পাঠিয়েছে। পুরনো ফোনগুলিতেও ওটিএ (OTA) সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে অ্যাপটি চাপিয়ে দেওয়া হবে।
সাইবার সুরক্ষার জন্য কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভারতে বিক্রি হওয়া সব স্মার্টফোনে বাধ্যতামূলক ‘সঞ্চার সাথী’, মুছতেও পারবেন না, নরেন্দ্র মোদী সরকারের এই সিদ্ধান্তই দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সিম-বাইন্ডিং নিয়ম নিয়ে বিতর্ক থামার আগেই এবার আরও কঠোর নির্দেশ জারি হল সরকারের তরফে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই টেলিকম দফতর (DoT) স্মার্টফোন নির্মাতাদের নির্দেশ পাঠিয়েছে। পুরনো ফোনগুলিতেও ওটিএ (OTA) সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে অ্যাপটি চাপিয়ে দেওয়া হবে। ভারতে এরকম অপসারণ-অযোগ্য সরকারি অ্যাপ বাধ্যতামূলক করার ঘটনা এই প্রথম।
এর আগে রাশিয়া এমন নিয়ম চালু করেছে, যেখানে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ম্যাক্স মেসেঞ্জার (MAX Messenger) সব ডিভাইসে বাধ্যতামূলক। সরকারি ব্যাখ্যা—এটি সুরক্ষা, ফোন ট্র্যাকিং ও প্রতারণা রোধে উপকারী। কিন্তু বিশেষজ্ঞ ও ব্যবহারকারীদের বড় অংশ মনে করছেন—এর আড়ালে গোপনীয়তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ শুরু হল।
বর্তমানে সঞ্চার সাথী অ্যাপ এবং ওয়েবসাইট—দুই মাধ্যমেই ব্যবহার করা যায়। এখন পর্যন্ত এটি ব্যবহার করা ঐচ্ছিক হলেও, সরকারের দাবি—এই প্ল্যাটফর্ম নাগরিকদের সাইবার সুরক্ষা বাড়াবে এবং প্রতারণা বা ফোন চুরি সংক্রান্ত ঝামেলায় দ্রুত সাহায্য করবে।
সঞ্চার সাথী আসলে কী? (What is Sanchar Sathi)
সরকারি টেলিকম দফতরের উদ্যোগে তৈরি এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য হল—
মোবাইল সাবস্ক্রাইবারদের সুরক্ষা দেওয়া। সাইবার প্রতারণা সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতন করা। চুরি বা হারিয়ে যাওয়া ফোন খুঁজে পেতে সাহায্য করা এবং নিজের নামে চলা সন্দেহজনক মোবাইল সংযোগ শনাক্ত করা। ওয়েবসাইটের ভাষায়, “সঞ্চার সাথী মোবাইল গ্রাহকদের ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং সরকারের জনমুখী উদ্যোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে তৈরি করা হয়েছে।”
কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে সঞ্চার সাথীতে? (Sanchar Sathi app utility)
ক. চুরি বা হারানো ফোন ব্লক ও ট্র্যাকিং। অ্যাপ বা ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি হারানো ফোন ব্লক করা যায়।
খ. কেউ ব্লক করা ফোন ব্যবহার করতে গেলে তার ট্রেস পাওয়া যায়।
গ. ফোন ফিরে পেলে একই প্ল্যাটফর্ম থেকে আনব্লক করা যায়।
ঘ. সারা দেশে ফোন খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় IMEI নম্বর ব্যবহার করে।
ঙ. নিজের নামে থাকা মোবাইল সংযোগ চেক করা যায়। কখনও কখনও নিজের নামে অজান্তেই একাধিক সংযোগ খোলা হয়। এই অ্যাপ দেখিয়ে দেয়—আপনার নামে মোট কতগুলি সিম চলছে।
চ. ‘চক্ষু’—এটি হল সাইবার প্রতারণা রিপোর্ট করার সেবা। অ্যাপের গুরুত্বপূর্ণ ফিচার Chakshu (চক্ষু) সন্দেহজনক কল, SMS, WhatsApp—সব ধরনের প্রতারণামূলক যোগাযোগ রিপোর্ট করার সুযোগ দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাঙ্ক/KYC ফিশিং কল, TRAI/DoT সেজে ফোন করা, পুলিশের ছদ্মবেশে প্রতারণা, স্টক/ইনভেস্টমেন্ট প্রতারণা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বীমা–সংক্রান্ত ভুয়ো বার্তা, সন্দেহজনক লিঙ্ক বা APK ফাইল।
তবে, টেলিকম দফতর জানিয়েছে—চক্ষু সাইবার অপরাধের অভিযোগ জানানোর জায়গা নয়। সাইবার ক্রাইমের জন্য জাতীয় সাইবার পোর্টালই ব্যবহার করতে হবে।
ছ. অনাকাঙ্ক্ষিত বাণিজ্যিক কল/SMS (Spam) রিপোর্ট করা যায়। টিআরএআই-এর ২০১৮ সালের নিয়ম অনুযায়ী স্প্যাম কল বা মেসেজ রিক্লেম করার ব্যবস্থাও আছে।
সাইবার সুরক্ষায় কেন গুরুত্বপূর্ণ সঞ্চার সাথী?
ক্রমবর্ধমান সাইবার প্রতারণা, OTP চুরি, ফিশিং লিঙ্ক, ডিভাইস ক্লোনিংয়ের ঘটনার মধ্যে অ্যাপটি সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য তাৎক্ষণিক সুরক্ষার একটি বড় ব্যবস্থা। WhatsApp, Telegram, iMessage, SMS—যে কোনও প্ল্যাটফর্মের ভুয়ো যোগাযোগ রিপোর্ট করার সুবিধা রয়েছে। হারানো ফোন খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি দেশের সবচেয়ে কার্যকর সরকারিভাবে পরিচালিত সিস্টেম।
কোথায় পাওয়া যাবে অ্যাপটি?
সঞ্চার সাথী গুগল প্লে স্টোর এবং অ্যাপল অ্যাপ স্টোর—দুই জায়গাতেই পাওয়া যায়। ওয়েব ভার্সনও চালু রয়েছে: সেখান থেকেও সব ফিচার ব্যবহার করা যায়।
কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে এত বিতর্ক?—৫টি বড় কারণ (5 reasons for Sanchar Sathi Controversy)
১. ওই অ্যাপটি ‘সরকারি ট্র্যাকার’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। সঞ্চার সাথী এখন চুরি যাওয়া ফোন ব্লক/ট্র্যাক করতে সাহায্য করে। কিন্তু মুছতে না-পারার মতো করে অপারেটিং সিস্টেমে ঢোকানো হলে এটি কার্যত সরকারের জন্য একটি সর্বক্ষণিক ট্র্যাকিং টুলে পরিণত হতে পারে।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—আজ শুধু IMEI ট্র্যাকিং, আগামী দিনে কি ডিজিটাল আইডি বাধ্যতামূলক করে অ্যাপ আসবে? এটা কি ফোনে VPN নিষিদ্ধ করার টুল? মেসেজের কপি নিয়মিত পাঠানো হবে? এক সাইবার বিশেষজ্ঞের মতে, সরকার অপারেটিং সিস্টেম স্তরে ঢুকলে বা একবার সেই দরজা খোলা হলে তা আর কখনও বন্ধ হয় না।
২. ব্যক্তিগত পরিসরে সরাসরি হস্তক্ষেপ
আইনের চোখে মোবাইল ফোন ব্যক্তিগত পরিসরের অংশ, যেখানে—ব্যক্তিগত কথোপকথন, সংবেদনশীল তথ্য, ব্যক্তিগত ছবি, ডকুমেন্ট সবই থাকে। প্রশ্ন উঠছে—ফোনে রাখা এনক্রিপ্ট করা নেই এমন ফাইল বা মেসেজে সরকার প্রবেশ করবে না বা পড়ে কিংবা দেখে ফেলবে না—এর নিশ্চয়তা কোথায়? আজ যা নেই, কোনও ভবিষ্যৎ আপডেট তা যোগ করবে না—এভাবেই বা কে নিশ্চিত করবে? এটি অনেকের মতে গোপনীয়তার উপর সরাসরি আঘাত।
৩. ডেটা সুরক্ষা আইনে নিজেদের ছাড়
সরকার বহু ক্ষেত্রেই ডেটা প্রোটেকশন আইনের বাইরে নিজেকে রাখার ব্যবস্থা করেছে। ফলে— বেসরকারি সংস্থার ওপর আরও কড়া নিয়ম বলবৎ হচ্ছে। কিন্তু সরকারের দায়বদ্ধতা থাকছে তুলনামূলকভাবে কম। এখন বাধ্যতামূলক সরকারি অ্যাপ সেই দিকটিকেই আরও উন্মোচিত করছে বলে অনেকের মত।
৪. ‘ব্লোটওয়্যার’ এবার সরকারি রূপে
অনেক ফোনেই আগে থেকেই থাকে অপ্রয়োজনীয় কিছু অ্যাপ। তা ছাড়া এমন কিছু বাণিজ্যিক সফ্টওয়্যার থাকে যা ডিলিট করা যায় না। পর্যবেক্ষকদের কারও কারও মতে, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন, সরকার নিজেই ব্লোটওয়্যার চাপিয়ে দিচ্ছে। সাইবার বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি—“এখন তো সবাইকে ফোন রুট করতে হবে!”
৫. কোনও জনপরামর্শ নয়, কোনও খসড়া প্রকাশ নয়—সরাসরি চাপানো হয়েছে
ভারতের দূরসংযোগ দফতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে আগেও সমালোচনা হয়েছিল। এইবার, সঞ্চার সাথী অ্যাপ বাধ্যতামূলক করার আগে জনপরামর্শ হয়নি। খসড়া নীতি প্রকাশ হয়নি। তাই স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের মতে— “এটি গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
সঞ্চার সাথী—উপকারিতা কী কী? (সরকারের বক্তব্য) (Sanchar Sathi portal)
চুরি যাওয়া ফোন ব্লক/ট্র্যাক করতে পারে। IMEI নম্বরের ভিত্তিতে সারাদেশে কাজ করে। নিজের নামে কত সিম চলছে চেক করা যায়। অপরাধে ব্যবহার হওয়া ভুয়ো সিম সনাক্তে কার্যকর। ফিশিং, KYC প্রতারণা, WhatsApp স্ক্যাম—সব রিপোর্ট করা যায়। সরকারের দাবি, এটি সাইবার প্রতারণা কমাবে।
Partha Goswami
01/12/2025







