রাতন টাটার মৃত্যুর পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই, তাঁর রেখে যাওয়া সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ও উত্তরাধিকার নিয়ে এখন প্রবল টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে।
ভারতের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী টাটা গ্রুপের ভেতরে শুরু হয়েছে চরম অস্থিরতা (Tension in Tata Group)। রাতন টাটার মৃত্যুর পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই, তাঁর রেখে যাওয়া সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ও উত্তরাধিকার নিয়ে এখন প্রবল টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman) ও গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) মঙ্গলবার রাতে টাটা ট্রাস্ট (Tata Trust) ও টাটা সনস (Tata Sons)-এর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ছিলেন টাটা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান তথা প্রয়াত রতন টাটার সৎ ভাই নোয়েল টাটা, ভাইস চেয়ারম্যান ভেনু শ্রীনিবাসন, টাটা সনসের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরন, ও ট্রাস্টি দারায়ুস খাম্বাটা। দুই মন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন — “যেভাবেই হোক, টাটা ট্রাস্ট ও টাটা সনসের মধ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।”
সূত্রের খবর, রতন টাটার মৃত্যুর পর থেকেই টাটা ট্রাস্টের মধ্যে বিভাজন শুরু হয়ে যায়। অভিযোগ হল, সাতজন ট্রাস্টির মধ্যে চারজন—দারায়ুস খাম্বাটা, জেহাঙ্গির এইচ.সি. জেহাঙ্গির, প্রমিত জাভেরি, ও মেহলি মিস্ত্রি—ধীরে ধীরে একটি ‘সুপার বোর্ড’-এর মতো কাজ শুরু করেন। তাঁরা বোর্ড মিটিংয়ের নথি পরীক্ষা করা থেকে শুরু করে টাটা সনসের স্বাধীন পরিচালকদের নিয়োগ পর্যন্ত নিজেরা অনুমোদন দিতে থাকেন।এই চারজন ট্রাস্টির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তাঁরা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটার ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, নোয়েল টাটা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ট্রাস্টিরা মনে করছেন, এই আচরণ টাটা সনস-এর শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে।
টাটা সনস ও টাটা ট্রাস্টের মধ্যে এই অশান্তি সরকারকেও ভাবাচ্ছে। কারণ, এ ধরনের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন হলে বা অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের অর্থ ব্যবস্থার উপরেও সমূহ প্রভাব পড়ে। যা ভাবতে বাধ্য করে সরকারকেও। অতীতে প্রায় একই ধরনের অশান্তি দেখা গিয়েছিল আম্বানি পরিবারেও। ধীরুভাই আম্বানির মৃত্যুর পর দুই ভাই মুকেশ ও অনিল আম্বানির মধ্যে অশান্তি চরমে পৌঁছয়। তা শুধু আদালত পর্যন্ত গড়ায়নি, দুই ভাই পরস্পরের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিতেও শুরু করেন।
শেষমেশ মধ্যস্ততা করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। আম্বানি পরিবারের সঙ্গে প্রণবের সম্পর্ক ছিল সুবিদিত। মুকেশ ও অনিল—প্রণবকে ‘আঙ্কেল’ বলে ডাকতেন। দুই ভাইয়ের কোন্দল যখন চরমে তখন একদিন প্রণবকে ফোন করেন প্রয়াত ধীরুভাইয়ের স্ত্রী কোকিলা বেন। তিনি প্রণবকে বলেন, “আজ না হয় কাল আপনিও তো উপরে যাবেন। ধীরুভাই যখন তোমার কাছে জানতে চাইবে, আমার দুটো ছেলে ঝগড়া করছিল, ওদের থামালে না কেন প্রণব? তখন তুমি কী বলবে?”। কোকিলা বেনের ওই ফোন পাওয়ার পর মুকেশ ও অনিল দুই ভাইকে বুঝিয়ে ঝগড়া থামান প্রণব। এবার টাটা গোষ্ঠীর মধ্যে ঝগড়া থামানোর দায় এসে পড়েছে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের উপর। তবে নির্মলা অর্থমন্ত্রী হলেও তাঁর রাজনৈতিক ওজন ততটা নেই। তাই অমিত শাহও ছিলেন বৈঠকে। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, টাটা ট্রাস্টের ৬৬ শতাংশ শেয়ার টাটা সনস-এর হাতে থাকা মানে এই প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র একটি “পারিবারিক বিষয়” নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের বৃহত্তম কর্পোরেট সংস্থার ভবিষ্যৎ, হাজারো কর্মীর চাকরি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা। সরকারের নির্দেশ, যদি কোনও ট্রাস্টি গোষ্ঠীর স্থিতিশীলতা নষ্ট করেন, তবে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। বৈঠকের পর টাটা শীর্ষকর্তারা দিল্লিতেই একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা সেরে মুম্বই ফেরেন। আগামী ৯ অক্টোবর রতন টাটার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি স্মরণসভায় তাঁদের উপস্থিত থাকার কথা।
Partha Goswami
08/10/2025







